-->

করোনাভাইরাস: ফোন জীবাণুমুক্ত করবেন কিভাবে

How-To-Clean-Your-Smartphone

বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে প্রতিরোধ সুনিশ্চিত করাই হচ্ছে একমাত্র উপায় এই মহামারীর ছোবল থেকে রক্ষা পাওয়ার। 

বিশেষজ্ঞ দের মতে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে দৈনন্দিন কাজে হাত লাগলেই কেবল মাত্র এই ভাইরাস থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। এর জন্য তারা ভালোভাবে নিজস্ব হাত  ধোয়ার কথা বলেছেন নিয়মিত।

লিফটের বাটন, দরজার হাতল, খাবার প্লেট, পানির গ্লাস ইত্যাদি পৃষ্ঠ সমূহে লেগে থাকা জীবাণু থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা রীতিমতো অসম্ভব বিষয়।

এই জন্য প্রতিদিন বারবার নিজের নিজের হাত ভালোভাবে ধোয়াটা অতীব গুরত্বপূর্ণ। আপনার দৈনিক ব্যবহার্য জিনিসপত্র এর মধ্যে একটি হচ্ছে আপনার প্রিয় স্মার্টফোন। 

আরও পড়ুন –

ভাইরাস সংবলিত কিছু তথ্য–

Covid-19

২০১৭ সালে দা যোর্নাল জার্মস এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায় – '২৭ টি টিন এজারদের থেকে নেওয়া ফোনে ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান পাওয়া যায়।' তন্মধ্যে ছিল –ই. কোলি, স্ট্যাফাইলোকোকাস অরাস, স্ট্রেপটোকোকাস এর মতো জীবাণু।

জেনে রাখা ভালো মোবাইল ফোন কখনো কোনো ভাইরাস ছড়ানোর মুখ্য কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়নি। কিন্তু কিছু ভাইরাস এমন রয়েছে আপনার কল্পনার বাইরে। দীর্ঘ সময় জুড়ে আপনার ফোনের উপর লেগে থাকতে পারে।

চার্লস গারবা, পিএইচডি, যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানের এপিডেমিওলজি এবং বায়োস্ট্যাটিসটিকস এর একজন প্রফেসর তিনি বলেন – "অধিকাংশ কোল্ড এবং ফ্লু ভাইরাস শক্ত পৃষ্ঠে লেগে থাকতে পারে কিছু ঘণ্টা থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত। যদিও নরো ভাইরাস লেগে থাকতে পারে ৪ সপ্তাহ পর্যন্ত।"

তাই নিয়মিত আপনার স্মার্টফোন পরিষ্কার করার ব্যাপারে উদাসীন না হয়ে নিয়মিত পরিষ্কারে জোর দিলে আপনার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমবে।

ফোন পরিষ্কার করার সময় যা মাথায় রাখবেন–

  • কখনো আপনার ফোন এমন কোনো তরল দ্বারা পরিষ্কার করার চেষ্টা করবেন যার দ্বারা আপনি গ্লাস কিংবা শক্ত প্লাস্টিক এর জিনিসপত্র পরিষ্কার করেন।
  • গ্লাস ক্লিনার, বাথরুম ক্লিনার, মেটাল ব্লিচ প্রকৃতির জিনিস নিজের ফোনে ব্যাবহার করা থেকে বিরত থাকুন।
  • কখনো কোনো তরল সরাসরি আপনার ফোনে স্প্রে করা থেকে বিরত থাকুন এবং কখনো ফোন পানিতে বেশি ভেজাবেন না আইপি সার্টিফিকেট থাকার পরও যাতে করে এর মধ্যে পানি প্রবেশ না করে।
  • অ্যাপেল ইউজারদের সতর্ক করেছে  বানিজ্যিকভাবে প্রকাশিত ক্লিনারসমূহ ফোনের ফিঙ্গারপ্রিন্ট রেসিসটেন্স এবং সম্ভবত ফোনের গ্লাস স্ক্র্যাচ করে দিতে পারে। 
  • স্যামসাং এবং অ্যাপেল উভয় তাদের ওয়েবসাইটে বলেছে যে ৭০% আইসোপ্রপিল অ্যালকোহল আছে এমন ক্লিনার দ্বারা একটা মাইক্রো ফাইবার ক্লথ দিয়ে আপনার ফোন জীবাণুমুক্ত করতে পারেন।

ফোন জীবাণুমুক্ত করার জন্য যা ব্যাবহার করবেন–

  • অ্যালকোহল দ্বারা আপনার ফোন পরিষ্কার করার কথা ভাবতে পারেন তবে ভুলেও সরাসরি অ্যালকোহল আপনার ফোনের উপর ইউজ করবেন না।
  • সরাসরি অ্যালকোহল ব্যাবহার করলে এটা আপনার ফোনের অলিওফোবিক এবং হাইড্রোফোবিক কোটিং নষ্ট করে দিতে পারে যা আপনার ফোনকে তেল এবং ধুলোবালি থেকে রক্ষা করে।
  • কেউ হয়তো আপনাকে অ্যালকোহল এর সাথে পানি মিশিয়ে ব্যাবহার করতে বলতে পারে কিন্তু সেখানে সঠিক অনুপাতে মিশ্রণ তৈরি করা খুবই কঠিন।
  • তাই সবচেয়ে ভালো এমন ক্লিনার ব্যাবহার করা যেখানে ৭০% আইসোপ্রপিল অ্যালকোহল আছে। কিন্তু কখনো সরাসরি স্প্রে করে নিজের ফোনের ক্ষতি করবেন না।

যেভাবে ফোন পরিষ্কার করবেন–

Clean-Your-Phone
Image Courtesy: Times

১. ফোনের কেস খুলে ফেলুন এবং ফোনটি পাওয়ার অফ করে দিন –

সবচেয়ে বেসিক যে কাজটি আপনাকে করতে হবে সেটা হচ্ছে আপনার ফোন শাট ডাউন করে দেওয়া এবং কেস লাগানো থাকলে সেটা খুলে ফেলা। 

জানি কেউ করবেন না কিন্তু চার্জিং অবস্থায় ফোনের উপর তরল ফেলার কথা ভুল করেও মাথায় আনবেন না। 

ফোন শাট ডাউন করে দিলে আপনি এবং আপনার ফোন বিশ্রামের সহিত সব কাজ সম্পন্ন করতে পারবেন।

২. মাইক্রো ফাইবার ক্লথ দিয়ে পলিশ করুন –

আলতো ভাবে আপনার ফোনের পিছনের দিক পরিষ্কার করুন একটি নরম মাইক্রো ফাইবার ক্লথ দিয়ে যাতে সব ছাপ সরে যায়। 

এতে আপনার ফোনের জীবাণু সরে যাবে মাইক্রো ফাইবার ক্লথ এবং ফোনের মধ্যকার ঘর্ষনের কারণে। 

এতে জীবাণু মরে যাবে না কিন্তু সেগুলো উঠে যাবে মোবাইল পৃষ্ঠ থেকে।

মাইক্রো ফাইবার ক্লথ অন্যান্য সব পেপার টাওয়েল থেকে ভালোভাবে পরিষ্কার করতে পারে।

৩. লাইসল ওয়াইপ ব্যাবহার করুন –

লাইসল পণ্য ক্রেতাদের কাছে দাবি করে ইলেকট্রিক্যাল যন্ত্রপাতির জন্য এদের ক্লিনার ব্যাবহার করা যাবে। 

যদি বেশি তরল পরে যায় ফোনে তাহলে সেটা আগে অপসারণ করুন তারপর সাবধানে সারা ফোন পৃষ্ঠ পরিষ্কার করুন পোর্টগুলো বাদ রেখে।

৪. ফোন ৫ মিনিটের জন্য বাতাসে শুকাতে দিন–

সারা ফোনের পৃষ্ঠ পরিষ্কার করার পর অন্তত পক্ষে ১০ মিনিট এর জন্য শুকোতে দিন। 

যদিও ফোর্ট বলে এসব ডিসিনফেক্টর ওয়াইপ এর মাত্র ৪ মিনিট লাগে পুরো ফোন জীবাণুমুক্ত করার জন্য।

৫. পেপার টাওয়েল বা মাইক্রো ফাইবার ক্লথ দ্বারা সব তরল মুছে ফেলুন –

যদি কোনো তরল ফোনপৃষ্ঠে অবশিষ্ট থাকে তাহলে সেটা অন্য একটা পরিষ্কার মাইক্রো ফাইবার ক্লথ কিংবা পেপার তাওয়েল দিয়ে মুছে ফেলুন।

আপনি মাইক্রো ফাইবার ক্লথ পরিষ্কারের জন্য এটি পানিতে ফুটাতে পারেন কিংবা ব্লিচিং ব্যাবহার করতে পারেন।

৬. আপনার ফোনে কেস পরিষ্কার করুন – 

সর্বশেষে আপনার ফোনের কেস পরিষ্কার করুন। তবে এখানে আপনি একটু শক্তিশালী ক্লিনার ব্যাবহার করতে পারেন যা গ্লাস পরিষ্কার করতে ব্যাবহার করেন কেননা বেশিরভাগ কেসগুলোই টেকসই কঠিন প্লাস্টিক দ্বারা বানানো হয়।

তবে স্মার্টফোনের আনুষঙ্গিক উপকরণে যেগুলো লেদার বা ফেব্রিক দ্বারা তৈরী সেগুলোর উপর ব্লিচিং ব্যাবহার করা থেকে বিরত থাকুন।

সাবান-পানি ব্যাবহার করে ফোন পরিষ্কার করতে পারবেন ?

How-To-Clean-With-Soap

সবচেয়ে ভালো হবে যদি আপনি লাইজল ব্র্যান্ড এর প্রোডাক্ট ইউজ করেন কারণ তারা সরাসরি বলেছে তাদের ক্লিনার ব্যবহার করে যেকোনো ডিভাইস পরিষ্কার করলে সেটা আপনার ফোনের কোনো ক্ষতি করবে না।

হ্যা, আপনি অবশ্যই সাবান-পানি এর মিশ্রণ তৈরি করে সেটা দিয়ে মাইক্রো ফাইবার ক্লথ ভিজিয়ে ফোন জীবাণু মুক্ত করতে পারবেন। 

ফোর্ট বলছে, "সাবান এবং পানির ব্যাবহার করে ফোন পরিষ্কার করলে রীতিমতো আসল ক্লিনার এর মত পরিষ্কার হবে না কিন্তু আপনার ফোনের উপর থাকা জীবাণু ধ্বংস করতে সাহায্য করতে পারে যদি আসল ক্লিনার দ্বারা যেভাবে পরিষ্কার করতে হয় সেভাবে পরিষ্কার করলে।" 

বোনাস টিপ

আপনি একটা স্ক্রিন প্রটেক্টর কেনার কোথাও ভাবতে পারেন। যদিও প্রায় সব দোকানই এখন বন্ধ।

স্ক্রিন প্রটেক্টর শুধু মাত্র আপনার ফোনের স্ক্রিন কে যে আকস্মিক পড়ে যাওয়ার থেকে বাঁচাবে সেটা নয়;

যেকোনো শক্তিশালী ক্লিনার বা এই প্রকৃতির অন্য কিছু ব্যাবহার করা যাবে। কেননা এদের মধ্যে কোনো অলিওফোবিক কোটিং থাকে না।

দিনে কতবার আপনার ফোন পরিষ্কার করবেন ?

আপনাকে প্রত্যেক দিন সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে ফোন পরিষ্কার করতে হবে না। নিজের টেবিল বা যেখানে বসে কাজ করেন সেখানে দু-তিনটা পরিষ্কার মাইক্রো ফাইবার ক্লথ রেখে দিবেন।

প্রায়শই সেটা দিয়ে ফোনের উপর লেগে থাকা ময়লা সরিয়ে ফেলবেন। ফোর্ট বলছে, "শীতকালে লাইজোল উয়াইপ কিংবা সাবান পানি দিয়ে সপ্তাহে অন্ততপক্ষে ২ বার নিজের ফোন পরিষ্কার করবেন।"

যদি প্রতিদিন ফোন পরিষ্কার করার মত কাজ আপনার কাছে অনেক কঠিন মনে হয় তাহলে আপনি আল্ট্রা ভায়োলেট রশ্মি দ্বারা আপনার ফোনে জীবাণু মুক্ত করতে পারবেন।

যেভাবে আপনার ফোন পরিষ্কার রাখবেন–

যানবাহনে থাকাকালীন সময়ে ফোন ব্যাবহার থেকে বিরত থাকুন – 

দেশে যানবাহন চলাচল উন্মুক্ত করে দেওয়ার পর অনেকেই যানবাহনে উঠছেন।এমন হতে পারে যে আপনি গাড়ির রেলিং বা হ্যান্ডেল এ হাত দিয়ে আছেন। 

এমতাবস্থায় সম্ভব হলে আপনার ফোনে ব্যাবহার করা থেকে বিরত থাকুন। কারণ হ্যান্ডেল বা রেলিং এ জীবাণু এমনকি করোনা থাকার আশঙ্কা থেকেই যায়।

তাই সবচেয়ে ভালো হবে যদি আপনি যানবাহনে বসে ফোন চালান এবং কোনো ধাতব পদার্থ না ধরে চালান যদি একান্ত প্রয়োজন বোধ করেন ফোন ব্যাবহার করার।

বাথরুমের ভিতরে ফোন নিবেন না – 

যদি আপনার বাথরুমে ফোন ব্যাবহার করার অভ্যাস থেকে থাকে তবে সেটা এখনই পরিহার করুন। 

অনেক গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে আপনার বাসার মধ্যে যদি এমন কোনো জয়গা থেকে যেখানে জীবাণুরা ঘাপটি মেরে বসে থাকে তাহলে সেটা হচ্ছে আপনার বাথরুম। 

তাই কখনোই ফোন বাথরুমে নিবেন না কারণ পানিতে ফোনের ক্ষতি হবে এবং টয়লেট ব্যাবহারের পর অবশ্যই অবশ্যই হাত ধুবেন। সবাই ধয়।

নিজের পোশাক-পরিচ্ছেদ নিয়মিত ধোবেন– 

সত্যি কথা বললে আপনার ফোন সারা দিন যেই পকেটে থাকে সেই পকেটে যদি পরিষ্কার না হয় তাহলে এত কিছু করে কোনো লাভ হবে না। 

অনেক গণমাধ্যম বলছে, "কাপড়-চোপর সাবান পানিতে আধ ঘন্টার মত রেখে তারপর ধুয়ে শুকিয়ে পরিধান করুন। এছাড়া রোদের মধ্যে কাপড় রেখে দিলেও জীবাণু মরে যাবে। তাই রোড উঠলেই কাপড় টানিয়ে দিবেন। 

ফোনের সয়ংক্রিয় ভয়েস সার্ভিস কাজে লাগান–

ধরুন আপনি এমন এক অবস্থায় রয়েছেন যেখানে আপনার পক্ষে ফোন এর নোটিফিকেশন চেক করা কিংবা কল রিসিভ করা অনেক কষ্টসাধ্য কিংবা অসম্ভব।

এমন সময়ে আপনি ফোনের অটোমেটেড ভয়েসের সাহায্য নিয়ে নিজের স্বীয় কাজটি করতে পারেন।

আজকাল সব ফোনেই গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট আগে থেকেই দেওয়া থাকে। গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট অস্থির কাজ করে। একবার 'ওকে গুগল' বলেই দেখুন।

নিয়মিত হাত ভালোভাবে পরিষ্কার করুন– 

এখনও যদি আপনি প্রতিনিয়ত হাত স্যানিটাইজ না করে থাকেন তাহলে এখনই ফোন রেখে হাত ধুয়ে আসুন। 

আপনি যদি ধৈর্য ধরে এখন পর্যন্ত এই পোস্টটি পড়ে থাকেন তাহলে আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। 

কিন্তু এতক্ষনে আপনার হাত থেকে অনেক তেল বের হয়েছে তাই এখনি সাবান দিয়ে ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধূবেন কিংবা হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত জীবানুমুক্ত করবেন।

কিছু কথা

আজকের দিনে আমাদের পৃথিীজুড়ে মানুষের মৃত্যুর সাগরে লাল রক্ত এখনও বয়ে চলেছে। 

জানি না রক্তের সাগর আর কত লাল হবে। সুতরাং, নিজের জীবন-মরণ এখন নিজের সাবধানতার উপর নির্ভর করছে। 

বাকিটা আল্লাহ জানেন। কিন্তু প্রাণ রক্ষা করা ফরজ। তাই নিজের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করা আপনার দায়িত্ব। নিজের পরিবারকে বাঁচান, নিজের দেশকে বাঁচান, ধরণী কে বাঁচান। আল্লাহ হাফেজ। 

অপেক্ষাকৃত নতুন পুরনো